ইউটিউবে ভিউ বাড়ানোর প্রতিযোগিতা, হুমকির মুখে সংগীতের মান

0 ২৭৫

দেশের আনাচে কানাচে, অলিতে গলিতে, রাস্তায়-দোকানে গান বাজছে। সবার মুখে মুখে ফিরছে একই গান। গত কয়েক বছর আগেও একটি গান শ্রোতাপ্রিয় কতটুকু হয়েছে তা বোঝা যেত এরকম চিত্রের মধ্য দিয়েই। ডিজিটাল পদ্ধতিতে গান প্রকাশের আগে সিডির জামানা পর্যন্ত গান হিট না ফ্লপ তা নির্ভর করতো বিভিন্ন স্থানে সেটি কতটুকু ছড়িয়েছে তার ওপর ভিত্তি করে। কিন্তু এখন সিডি মাধ্যম বিলুপ্তপ্রায়। প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো সিডি প্রকাশ করছে না বললেই চলে। সব গানই প্রকাশ হচ্ছে ইউটিউবে। চলতি বছর এসে আমাদের দেশে গান প্রকাশের সব থেকে সহজ ও বড় মাধ্যম হয়ে উঠেছে ইউটিউব। তবে এ বছর ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিওর মাধ্যমে ইউটিউব ভিউস বাড়ানোটা যেন কালচারে পরিণত হয়েছে। বিপত্তিটা সেখানেই। অডিওর চাইতে বেশি গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে ভিডিওতে। যার ফলে গানের মান সে অর্থে আগের মতো করে পাওয়া যাচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে জনপ্রিয় গীতিকবি, সুরকার ও শিল্পী শফিক তুহিনতো বলেই ফেললেন, এখন কেবল ভিউস এবং নিউজ। কোনো গান প্রকাশ হলেই তা বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ইউটিউব ও ফেসবুকে জোর প্রচারণা চালানো হচ্ছে। পরদিন নিউজ হচ্ছে ‘একদিনে এক লাখ ভিউজ’। এক সপ্তাহ পরই সেই গানের কথা ভুলে যাচ্ছেন শ্রোতারা। জায়গা করে নিচ্ছে আরেকটি ব্যয়বহুল গানের ভিডিও। তবে আমি মনে করি এই ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিওর কালচার থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। কারণ, এর ফলে গানের কথা ও সুরের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। নজর দেয়া হচ্ছে ভিডিওর দিকে। যার ফলে গানের মান কমছে। চোখ ধাঁধানো ভিডিও করে সেটি প্রকাশের পর সাময়িকভাবে বাহবা মিলছে। কিন্তু গান দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। এই বিষয়টি থেকে না বের হতে পারলে সংগীত খুব খারাপ একটি অবস্থায় চলে যাবে। চলতি বছরের হিসাব কষলে দেখা যাবে এ পর্যন্ত যে গানগুলো সাময়িকভাবে আলোচনায় এসেছে তার সবই ব্যয়বহুল ভিডিও নির্ভর। ৫ থেকে ১০ লাখ টাকা নির্মাণ ব্যয়ে করা হয়েছে এসব গান। অথচ অডিওতে এর চার ভাগের এক ভাগ অর্থও খরচ করা হয়নি। অনেক ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিওর মাঝে কিছুটা প্রশান্তি ছড়িয়েছে আসিফ আকবরের ‘আগুন’ এবং ইমরানের ‘ধোয়া’ গানটি। এ দুটি গানই আলোচনায় রয়েছে এখন পর্যন্ত। তবে এর বাইরে প্রকাশিত লাখ লাখ টাকা নির্মাণে করা একটি গানও ১৫ দিনের বেশি আলোচনায় থাকেনি। কথা ও সুরের দুর্বলতার কারণেই এমনটা হচ্ছে বলে মনে করছেন জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী ফাহমিদা নবী। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিওর প্রতিযোগিতা চলছে এখন। গানের মানের দিকে নজর নেই। এ কারণে এগুলো বেশিদিন টিকছে না। আমি মনে করি একটি ভালো কথা-সুরের গান ভিডিও না হলেও তার অডিওই ইউটিউবে শুনবে মানুষ। সে গানই টিকে থাকবে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। ব্যয়বহুল মিউজিক ভিডিওর পেছনে ছোটা বোকামি বলেই মনে হয় আমার কাছে। কিন্তু ইউটিউব ভিউস কি একটি গান জনপ্রিয়তা বিচারের মাধ্যম? উত্তরে ফাহমিদা নবী এক গাল হাসি দিয়ে বলেন, কখনোই এটা হতে পারে না। কোটি কোটি কিংবা লাখ লাখ ভিউস হচ্ছে অনেক গানের। সেগুলো সব কি জনপ্রিয়? নিশ্চয়ই না। আকাশে চাঁদ উঠলে কিন্তু সবাই দেখবে। জোর করে চাঁদ দেখাতে হবে না। সুতরাং একটি গান হিট হলে সেটা সবার মুখে মুখে থাকবে। এটাই স্বাভাবিক। এদিকে গানের মানের পেছনে না ছুটে ব্যয়বহুল ভিডিও এবং ইউটিউব ভিউসের পেছনে ছোটাটাকে সংগীতের ভবিষ্যতের জন্য মারাত্মক বলে মনে করছেন সংগীতবোদ্ধারা। এর ফলে গানের মানে ধস নামার আশঙ্কার কথাও জানিয়েছেন তারা। খুব দ্রুতই এ জায়গা থেকে সরে না আসতে পারলে দেশীয় সংগীতের ঐতিহ্য হুমকির মুখে পড়বে বলেও মনে করছেন সংগীতবোদ্ধারা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মন্তব্য
Loading...