তিন মাসেই ৪৬ হাজার কোটি টাকার ঋণ বিতরণ

0 ২২০

তিন মাসে (২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ডিসেম্বর) দেশের ব্যাংকগুলো ৩০ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করলেও এর দেড়গুণের বেশি পরিমাণ ঋণ বিতরণ করেছে। এই সময়ে ব্যাংকগুলো ৪৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকার ঋণ বিতরণ করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এই তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই তিন মাসে আমানতের চেয়ে অতিরিক্ত ১৫ হাজার ৬৫৭ কোটি বেশি ঋণ বিতরণ হয়েছে। এ কারণে ব্যাংক খাতে অর্থের টান পড়েছে। আবার আমদানির চাহিদা মেটাতে প্রতিনিয়ত কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ডলার কিনছে ব্যাংকগুলো। তাতে ডলারের দাম বাড়ছে। সংকট মেটাতে গিয়ে চলতি অর্থবছরে প্রায় ১২০ কোটি ডলার বিক্রি করে বাজার থেকে প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকা তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এর ফলেও তারল্যসংকট তীব্র হচ্ছে। অর্থ সংকটে পড়ে কয়েকটি ব্যাংক নতুন করে ঋণ দিচ্ছে না। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো আমানত সংগ্রহে মরিয়া হয়ে উঠেছে। যে কারণে প্রায় সব ব্যাংকই বাড়িয়ে দিয়েছে সুদের হার।

কয়েকটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবাহ বৃদ্ধির সঙ্গে ব্যাংক ঋণে সুদের হারও বাড়ছে। ঋণের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে কোনও কোনও ব্যাংক ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে ঋণ দেওয়া শুরু করেছে। যদিও কয়েক মাস আগে ঋণ বিতরণ করে এক অঙ্কে সুদ পেয়েছে ব্যাংকগুলো। ব্যবসায়ীরাও জানিয়েছেন, কয়েক মাস আগেও ব্যাংকগুলো বড় গ্রাহকদের ৮-৯ শতাংশ সুদে ঋণ দিত, যা এখন দিচ্ছে ১০-১১ শতাংশ সুদে। একইভাবে বেড়ে গেছে ভোক্তা ও গৃহঋণের সুদের হারও।

এ প্রসঙ্গে অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) চেয়ারম্যান ও ঢাকা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ঋণের চাহিদা বাড়লেও আমানত সেইভাবে ব্যাংকগুলোতে আসছে না। তিনি উল্লেখ করেন, ব্যাংকগুলোতে যে পরিমাণ আমানত আসছে, তার চেয়ে বেশি পরিমাণ ঋণ যাচ্ছে। এ কারণে তারল্যের কিছুটা সংকট শুরু হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঋণে সুদের হার আবারও চলে গেছে দুই অঙ্কে। এখন ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।’ বিজিএমইএ সভাপতি উল্লেখ করেন, ব্যাংক ঋণে সুদের হার বাড়লে ব্যবসায় খরচ বেড়ে যায়। ঋণে সুদের হার এক অঙ্কে রাখার জন্য ব্যাংকগুলোর নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এ প্রসঙ্গে এফবিসিসিআই সভাপতি সফিউল ইসলাম মহিউদ্দিন বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘ঋণের সুদের হার বেড়ে যাওয়া অর্থনীতির জন্য ক্ষতির কারণ। আমরা এটি উদ্বেগের সঙ্গে লক্ষ্য করছি। তিনি বলেন, ‘আমরা চাই ঋণের সুদের হার সিঙ্গেল ডিজিটে থাকুক। তা না হলে ব্যবসা- বাণিজ্যে খরচ বেড়ে যাবে। এতে পণ্যের দামও বাড়বে। এতে মূল্যস্ফীতির ওপর চাপ পড়বে।

এ প্রসঙ্গে ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি আবুল কাসেম খান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দুই মাস আগেও ব্যাংকগুলো ৮ থেকে ৯ শতাংশ সুদে ঋণ প্রস্তাব দিতো। কিন্তু এখন সেই সুদের হার চলে গেছে দুই অঙ্কে। এখন ১০ থেকে ১২ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের পরিমাণ ছিল আট লাখ ৪৪ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকার। তিন মাস আগে অর্থাৎ ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ছিল সাত লাখ ৯৭ হাজার ৭৮৯ কোটি টাকার। এই হিসাবে তিন মাসে নতুন করে ঋণ বিতরণ করেছে ৪৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৭ সালের ডিসেম্বর শেষে ব্যাংকগুলোর আমানতের পরিমাণ ছিল ৯ লাখ ২৬ হাজার ১৭৯ কোটি টাকা। তিন মাস আগে আমানতের পরিমাণ ছিল ৮ লাখ ৯৫ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। ফলে তিন মাসের ব্যবধানে ব্যাংকগুলো নতুন আমানত সংগ্রহ করেছে ৩০ হাজার ৯৮৯ কোটি টাকা। এমন পরিস্থিতিতে ঋণ বিতরণ লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় বেশি হওয়ায় ঋণসীমা কমিয়ে লাগাম টেনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ব্যাংকাররা বলছেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নির্দেশনার কারণে অনেক ব্যাংক নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পালন করতে গিয়ে সবাই আমানত সংগ্রহে জোর দিয়েছে। বাজারে নতুন আমানত কম, তাই এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে বেশি সুদে স্থানান্তর হচ্ছে। এ কারণে আমানত ও ঋণ উভয়ের সুদহার বাড়ছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি বেড়ে যাওয়ায় ঋণে সুদের হারও বেড়ে গেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ডিসেম্বরে বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৮ দশমিক ১৩ শতাংশ। নভেম্বরে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয় ১৯ দশমিক ০৬ শতাংশ। অক্টোবরে ছিল ১৮ দশমিক ৬৩ শতাংশ। সেপ্টেম্বরে ১৯ দশমিক ৪০ শতাংশ, আগস্টে ১৯ দশমিক ৮৪ ও জুলাইয়ে প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১৬ দশমিক ৯৪ শতাংশ। জুনে ঋণ বৃদ্ধির হার ছিল ১৫ দশমিক ৬৬ শতাংশ।

স্বাধীনতার পর ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে সুদের হার এক অঙ্কে নেমে যায়। শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাসে এই সুদের হার সর্বনিম্ন হিসেবে বিবেচিত হয়। এর আগে সর্বনিম্ন সুদহার ছিল ১৯৭৮ সালের ডিসেম্বরে। ওই সময়ে ব্যাংকগুলো গড়ে ১০. ৩৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিয়েছে।

জানা গেছে, ব্যাংক ঋণে সুদহার প্রথম ১১ শতাংশের নিচে নেমে আসে ১৯৭৭ সালের ডিসেম্বরে। তখন সুদের হার ছিল ১০ দশমিক ৭৯ শতাংশ। এরপর ১৯৮০ সালের ডিসেম্বরে ১৩ শতাংশের ওপরে ওঠে। ১৯৮৩ সালে তা দাঁড়ায় ১৪ দশমিক ৫৫ শতাংশে। এরপর ১৯৯২ সালের জুনে ১৫ দশমিক ১২ শতাংশে দাঁড়ায়। এরপর থেকে ব্যবসায়ীরা সুদের হার কমানোর দাবি জানাচ্ছেন। এমন পরিস্থিতিতে ২০১২ সালে ব্যাংকগুলো নিজেরা বসে ঋণ ও আমানতে সুদহারে সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেয়। এরপর থেকে ঋণের সুদহার ধারাবাহিকভাবে কমছে। ২০১৪ সালের প্রথম প্রান্তিকে গড় সুদহার ১২ শতাংশের ঘরে নেমে আসে। ২০১৩ সালে নেমে আসে ১১ শতাংশে। ২০১৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তা ১০ শতাংশের ঘরে ছিল। ২০১৬ সালের নভেম্বরে প্রথমবারের মতো সেটি নেমে আসে এক অঙ্কে অর্থাৎ ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মন্তব্য
Loading...