কিশোরগঞ্জে শিশু গৃহকর্মীর ওপর বর্বরতা

0 ৭০৭

মনি আক্তার নামে ১২ বছর বয়সী গৃহকর্মীর শরীরে গরম পানি ঢেলে নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে। গৃহকর্ত্রীর ঢেলে দেয়া গরম পানিতে শিশুর ডান চোখ, বুক, দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন অংশ ঝলসে গেছে। ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে দগ্ধ শিশুটিকে চিকিৎসা পর্যন্ত দেয়া হয়নি।

শিশুটির অবস্থার অবনতি হওয়ায় সম্প্রতি তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। শিশুটির রিকশাচালক বাবা টাকার অভাবে প্রয়োজনীয় ওষুধপত্রও কিনতে পারছেন না। ফলে দুঃসহ যন্ত্রণায় হাসপাতালের বেডে কাতরাচ্ছে শিশুটি।

নির্যাতিত গৃহকর্মী মনি আক্তার কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জ উপজেলার হাত্রাপাড়া গ্রামের মো. আবদুল আজিজের কন্যা। গত ১৭ই জানুয়ারি সকালে নরসিংদীর পশ্চিম ব্রাহ্মণদী এলাকার ব্যাংক কর্মকর্তা হাসান সারোয়ার সোহেলের বাসায় শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের এই অমানবিক ঘটনাটি ঘটে। এ ঘটনায় নির্যাতিত শিশুর বাবা আবদুল আজিজ বাদী হয়ে বুধবার

নরসিংদী সদর মডেল থানায় গৃহকর্ত্রী মাহমুদা ইয়াসমীন নাজমা ও তার স্বামী হাসান সারোয়ার সোহেলকে আসামি করে মামলা করেছেন।
মনি আক্তারের বাবা মো. আবদুল আজিজ জানান, অভাবের তাড়নায় তিনি স্ত্রী শিউলী বেগম এবং শিশুকন্যা মনিকে নিয়ে নরসিংদীর দাসপাড়া এলাকার একটি বাসায় ভাড়ায় থেকে সেখানে রিকশা চালান তিনি।

ঘটনার মাস খানেক আগে নরসিংদীর পশ্চিম ব্রাহ্মণদী এলাকার ব্যাংক কর্মকর্তা হাসান সারোয়ার সোহেল তার বাসায় কাজের জন্য মনিকে নিয়ে যান। ওই গৃহকর্তার বাসায় তার ছোট্ট মেয়েকে সারাদিনই কাজ করানো হতো। ঠিকমত কাজ করতে না পারলেই গৃহকর্ত্রী মাহমুদা ইয়াসমীন নাজমা অমানুষিক নির্যাতন চালাতেন।

নির্যাতনের বিষয়টি জানতে পেরে শিশুটির বাবা-মা মনিকে ওই বাসা থেকে আনতে গেলে, মনির সঙ্গে গৃহকর্ত্রী নাজমা খারাপ আচরণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেন। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ১৭ই জানুয়ারি সকালে তুচ্ছ বিষয়কে কেন্দ্র করে শিশুটির সঙ্গে গৃহকর্ত্রী নাজমা গালিগালাজসহ খারাপ আচরণ শুরু করে।

এক পর্যায়ে উত্তেজিত নাজমা গ্যাসের চুলায় পাতিলে রাখা গরম পানি মনির শরীরে ঢেলে দেয়। এতে মনির মুখের ডান পাশ, বুক এবং দুই হাত ঝলসে যায়। শিশুটির আর্তচিৎকার শুনে প্রতিবেশীর এগিয়ে গিয়ে মনিকে উদ্ধার করে নরসংিদী জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন।

খবর পেয়ে মনির বাবা ও মা হাসপাতালে গিয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে মনিকে বাসায় নিয়ে যান। পরবর্তিতে মনির অবস্থার অবনতি হলে তাকে আবারও নরসিংদী জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানকার চিকিৎসকেরা মনিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার্ড করেন।

বর্বর এই শিশু নির্যাতনে ঝলসে যাওয়া শিশুটির ছবি দিয়ে করিমগঞ্জের আনোয়ার হোসেন এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে বিষয়টি তুলে ধরলে হৈ চৈ পড়ে যায়। মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় ঝলসে যাওয়া শিশুর পাশে অসহায় বাবার করুণ মুখচ্ছবি। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ছুটে যান বেশ কয়েকজন মানবাধিকার কর্মী।

তবে গরম পানি ঢেলে গৃহকর্মীকে নির্যাতনের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন অভিযুক্ত মাহমুদা ইয়াসমীন নাজমার স্বামী হাসান সারোয়ার সোহেল। তিনি দাবি করেন, ‘ঘটনাটি আসলে দুর্ঘটনা। সকালে কাজ করার সময় চুলা থেকে মনির জামায় আগুন ধরে যায়। চিৎকার শুনে আমরা তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে যাই এবং চিকিৎসার যাবতীয় খরচ পরিশোধ করি।

একপর্যায়ে মেয়েটির পরিবার চিকিৎসা করাতে অনিহা দেখালে আমি পুলিশে খবর দিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি। এখন হঠাৎ করে আমার ও আমার স্ত্রীর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ কেন তোলা হচ্ছে বুঝতে পারছি না।’

নরসিংদী সদর মডেল থানার ওসি গোলাম মোস্তফা জানান, শিশুটির বাবা বাদী হয়ে গৃহকর্ত্রী ও তার স্বামীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেছেন। বিষয়টি তদন্ত করা হচ্ছে। এছাড়া অভিযুক্তদের ধরতে পুলিশ তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে।

মন্তব্য
Loading...