Sylhet Express

রোহিঙ্গাদের যে কথা বলেছেন মিয়ানমারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (ভিডিও)

0 ৯৭৯

বান্দরবান জেলার নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম ইউনিয়নে তমব্রু একটি দুর্গম গ্রাম। এই গ্রামেই বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে অবস্থান নিয়েছে প্রায় ছয় হাজার রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশু। এরা প্রায় সবাই মিয়ানমারের রাখাইনে সেনাবাহিনী নির্যাতনের শিকার হয়ে পাঁচ থেকে ছয় মাস আগে পালিয়ে এসে এই নো-ম্যানস ল্যান্ডে আশ্রয় নিয়েছে। কিন্তু গত ৯ ফেব্রুয়ারি বেলা ১১টার দিকে মিয়ানমারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অং সো রাখাইন পরিদর্শনের সময় সীমান্তে এসে রোহিঙ্গাদের নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে সরে যাওয়ার নির্দেশ দেন। সরে না গেলে পরিণাম ভালো হবে না বলেও হুমকি দিয়ে যান।

সীমান্তের এপার-ওপারের রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিয়ানমারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কথা বলার একটি ভিডিও চিত্র এ প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে দেখা যায়, সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার এপারে কিছু রোহিঙ্গা, আর ওপারে মিয়ানমার সরকারের উপ-স্বরাষ্টমন্ত্রী অং সো ও কিছু কর্মকর্তা। সেদেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা রোহিঙ্গাদের দিকে অস্ত্র তাক করে আছে। সঙ্গে কিছু সাংবাদিকও রয়েছেন। এসময় অং সো রোহিঙ্গাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলছেন এবং কিছু কিছু কথা রোহিঙ্গাদের বুঝিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছেন বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের একজন লোক।

এসময় মিয়ানমারের মন্ত্রী যা বলেন তার মানে দাঁড়ায়, ‘আমি তোমাদের সঙ্গে আপস করার জন্য আসিনি। এসেছি সীমান্তের এই রকম জায়গায় কেউ থাকতে পারে না সে বিষয়টি বলার জন্য। কারণ,এটি মিয়ানমারের জমি। তোমাদের এই জমিতে থাকার সুযোগ দেবো না। আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে বৈঠক করার সময় এই জমি পরিষ্কার করে দেওয়ার কথা বলেছি। মিয়ানমার সরকার আইনগতভাবে যেভাবে করা দরকার সেভাবে ব্যবস্থা নেবে। তোমরা যদি সরে না যাও তাহলে পরবর্তীতে এর পরিণতি ভয়াবহ হবে।’

সরেজমিনে বাংলাদেশ-মিয়ানমার তমব্রু সীমান্তে গিয়ে দেখা গেছে, মিয়ানমারের ওপারে কাঁটাতারের বেড়ার পাশেই ত্রিপল দিয়ে অস্থায়ী তাঁবু তৈরি করে অবস্থান নিয়েছে সে দেশের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) সদস্যরা। তাঁবুর পাশেই একটি গাছের ওপরে বাংলাদেশের দিকে মুখ করে মাইক বেঁধে প্রচারণা চালাচ্ছেন। এতে ঘোষণা দেওয়া হচ্ছে খুব দ্রুত নো-ম্যানস ল্যান্ড ছাড়তে হবে।

রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ বলেন, ‘ওইদিন (৯ ফেব্রুয়ারি) মিয়ানমারের উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মেজর জেনারেল অং সো আমাদের মিয়ানমারের ফেরত যাওয়ার কথা বলেননি। বলেছেন নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে চলে যেতে। আন্তর্জাতিক একটি মিডিয়ায় যে সংবাদ প্রকাশ হয়েছে সেটি সত্য নয়। আমরা মনে করি এটি একটি দীর্ঘ প্রক্রিয়া। আমাদের এই সমস্যা এখন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে চলে গেছে। একারণে এটি আন্তর্জাতিকভাবে সমাধান হতে হবে। কারণ আমাদের পক্ষে মিয়ানমারকে বিশ্বাস করা কঠিন।’

দিল মোহাম্মদ আরও বলেন, ‘মিয়ানমার যদি আমাদের আন্তরিকভাবে ফেরত নিত তাহলে আমাদের সঙ্গে কথা বলার সময় উপ-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মনোভাবে পরিবর্তন দেখা যেত। তার মধ্যে এসময় কোনও পরিবর্তন দেখা যায়নি। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে আমাদের ফেরত নেওয়ার কথা বলেছে। তবে আমাদের অধিকার নিয়ে কোনোমতেই রাখাইনে চলতে দেবে না। যেখানে নো-ম্যানস ল্যান্ডেই থাকতে দিচ্ছে না সেখানে মিয়ানমারে ফেরত নিবে কী করে?’

নো-ম্যানস ল্যান্ডের আরেক রোহিঙ্গা নেতা আরিফ আহমদ বলেন, ‘রাখাইনে তো এখনও নির্যাতন বন্ধ হয়নি। যার জ্বলন্ত প্রমাণ হচ্ছে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা এখনও পালিয়ে আসছে। এতেই বোঝা যায় মিয়ানমার আমাদের ফেরত নেবে না। কারণ মিয়ানমারের মংডু এলাকায় আমার কিছু আত্মীয়-স্বজন আটকা পড়ে আছে। তাদের কোথাও যেতে দিচ্ছে না। তারা খাবার সংকটে রয়েছে। এই পরিস্থিতে কোনও মানুষ না খেয়ে কতদিন থাকতে পারে?’ তিনি আরও বলেন, ‘মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যাপারে যে ট্রানজিট ক্যাম্প করছে বলে যে প্রচার চালাচ্ছে তা সত্য নয়। এটি একটি নাটক। আন্তর্জাতিক মহলকে দেখানোর জন্য একটি ঘর তৈরি করে তা প্রচার করছে।’

উল্লেখ্য, গত বছরের ২৪ আগস্ট রাতে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সহিংস ঘটনার পর বিপুল পরিমাণ রোহিঙ্গা প্রাণ ভয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়। তবে কিছু কিছু রোহিঙ্গা সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডে আটকা পড়ে। সেখানেই ছোট ছোট তাঁবু তৈরি করে অবস্থান নেয় তারা। ইতোমধ্যে নাইক্ষ্যংছড়ি ঘুমধুম সীমান্ত পয়েন্টে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ সরকার নো-ম্যানস ল্যান্ড থেকে সরিয়ে উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নিয়ে আসে। তবে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার তমব্রু সীমান্তের নো-ম্যানস ল্যান্ডের অন্তত আরও ছয় হাজার রোহিঙ্গা এখনও অবস্থান করছে।

মন্তব্য
Loading...