ছাত্রলীগের হাতে নির্যাতিত ঢাবি শিক্ষার্থী এহসানের বাবার চোখে অন্ধকার

0 ৩৯৩

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হলে ছাত্রলীগ নেতাকর্মীদের হাতে নির্যাতিত শিক্ষার্থী এহসান রফিকের পিতা রফিকুল ইসলাম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। গ্রামের ধুলা মেখে বেড়ে ওঠা এহসান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগে ভর্তি হওয়ার পর পরিবারের সবাই যে নতুন আশায় বুক বেঁধেছিল, সে আশা এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। ছেলের সাফল্যে নিজের জীবনের কষ্ট ভুলে যে চোখে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন শিক্ষক পিতা, সেই চোখে এখন অন্ধকার নেমেছে। এ ব্যাপারে চিকিৎসকের বরাত দিয়ে এহসানের বাবা বলেন, ‘এহসানের চোখের কর্নিয়া মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’

এহসানের পরিবার সূত্রে জানা যায়, ৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হলে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এহসানের ওপর হামলা চালায়। লোহার রডের আঘাতে তার মাথা ও চোখের মারাত্মক ক্ষতি হয়। পরে ওই অবস্থাতেই তাকে আটকে রাখা হয়। ৭ ফেব্রুয়ারি পালিয়ে হল থেকে বের হয়ে যান এহসান। এখনও তার মাথায় ব্যথা হচ্ছে, চোখে ঝাপসা দেখছেন তিনি। তার গায়ে জ্বর আসছে প্রতিনিয়ত। কিছু খেতে পারছে না। খাওয়ার পর মাঝে মধ্যে বমি আসছে। এ অবস্থায় পরিবারের উদ্যোগে তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারত নিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ বিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী এহসান রফিকের পিতা রফিকুল ইসলাম মন্টু জানান, তার দুই ছেলে। বড় ছেলে এহসান রফিক ও ছোট ছেলে এহতেশান রফিক। ছোট ছেলে কালীগঞ্জ মাহতাব উদ্দীন ডিগ্রি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র। তাদের মধ্যে এহসান রফিক মেধাবী ছাত্র। সে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজের বিভাগের সেরা ছাত্রদের একজন। অনেক কষ্টে তাকে লেখাপড়ার খরচ দিচ্ছিলেন তিনি। কিন্তু বর্তমানে ছেলের এ দুরবস্থা দেখে তারা ভেঙে পড়েছেন। পরিবারের মধ্যে হতাশা আর দুঃখ-কষ্ট বিরাজ করছে। তাদের সকল আশা-আকাঙ্খা ভেঙে খান খান হয়ে গেছে।

এহসানের বাবা আরও জানান, এহসান এখন লেখাপড়া করতে পারছে না। শুধুই কান্নাকাটি করছে। ছেলের এ অবস্থা দেখে পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। শুধু পরিবারই নয়, গ্রামবাসীর মনেও বিষয়টি দাগ কেটেছে।

ছেলের চিকিৎসার ব্যাপারে তিনি আরও বলেন, ‘শুক্রবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) এহসানকে চিকিৎসার করানোর জন্য যশোর কমিউনিটি আই হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এছাড়াও বারডেম চক্ষু বিভাগের প্রধান প্রফেসর নজরুল ইসলামকে দেখানো হয়েছে। আর মস্তিকের জন্য ডা. আব্দুস সালামকে দেখানো হবে। উভয় ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে তার পরবর্তী চিকিৎসা দেওয়া হবে। তবে ছেলের চোখের উন্নত চিকিৎসার জন্য খুব শিগগিরই তাকে ভারতের চেন্নাই নিয়ে যাওয়া হবে। পাসপোর্ট করতে দেওয়া হয়েছে। আগামী রবিবার অথবা সোমবারের মধ্যে পাসপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। পাসপোর্ট পেলে ভিসার জন্য আবেদন করা হবে।’ বর্তমানে নিজ খরচেই ছেলের চিকিৎসা করাচ্ছেন বলেও জানান তিনি।

এ ব্যাপারে এহসানের বাবা আরও জানান, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এহসানের চিকিৎসা ব্যয়ের প্রতিশ্রুতি দিলেও তা কবে পাওয়া যাবে তা অনিশ্চিত। যে কারণে নিজ খরচেই ছেলের চিকিৎসা করছেন তিনি।

আহত এহসান জানায়, মার্কেটিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ওমর ফারুক প্রায় তিন মাস আগে তার কাছ থেকে ক্যালকুলেটর ধার নেয়। ওমর ফারুকের কাছে অনেকবার ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়া হয়েছে। কিন্তু ওমর ফারুক বরাবরই ক্যালকুলেটর পরে দেওয়ার কথা বলত। সর্বশেষ ৬ ফেব্রুয়ারি রাতে ক্যালকুলেটর দাবি করলে ওমর ফারুক তাকে মারধর করে। এরপর ওমর ফারুক হল শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আরিফের মাধ্যমে এহসানকে টিভি রুমে ডেকে নেয়। এসময় টিভিরুমে উপস্থিত ছিলেন হল শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি তানিম, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আনিম ইরতিজা শোভন ও আবু তাহের। সেখানে তারা এহসানকে শিবির অপবাদ দিয়ে মোবাইল কেড়ে নিয়ে ফেসবুক অ্যাকাউন্ট চেক করে। কিন্তু তারা ফেসবুকে কিছুই না পেয়ে জোর করে তার কাছ থেকে শিবির স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য বেদম মারধর করে।

এহসান আরও জানান, পরে ছাত্রলীগের হল শাখার সহ-সম্পাদক ওমর ফারুক ও রুহুল আমিন, সদস্য সামিউল ইসলাম সামী, আহসান উল্লাহ, উপ-সম্পাদক মেহেদী হাসান হিমেলের নেতৃত্বে রড ও লাঠি দিয়ে পেটানো হয় তাকে। মারধরের এক পর্যায়ে এহসান জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। অবস্থা বেগতিক দেখে আরিফ রাত সাড়ে ৩টায় এহসানকে ঢাকা মেডিক্যাল হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে এহসানকে আবারও হলে নিয়ে আসা হয়। এরপর হল শাখা সভাপতি তাহসান আহমেদের (১৬ নম্বর) কক্ষে আটকে রাখা হয় তাকে। সকালে এহসানের অবস্থা খারাপ হলে তাকে আবারও ঢাকা মেডিক্যালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে হলে এনে একই কক্ষে আটকে রাখা হয়। দুপুর আড়াইটার দিকে হল থেকে পালিয়ে আসে এহসান। পরে আহত এহসানের বাবা রফিকুল ইসলাম তাকে উদ্ধার করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।

এহসানের ব্যাপারে স্থানীয়রা জানান, এহসান রফিক এলাকা গর্বিত সন্তান। সে খুবই নম্র ও বিনয়ী। অসম্ভব মেধাবী ছাত্রও বটে। যার কারণে একটা পাড়া-গাঁ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত উঠে এসেছে রফিক। তার জন্য আমরা গর্ববোধ করি।

এহসানের শিক্ষক মিজানুর রহমান জানান, সে অত্যন্ত ভদ্র ও বিনয়ী ছেলে। লেখাপড়া শেষে দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার ইচ্ছা ছিল তার। যারা এহসানকে নির্মমভাবে নির্যাতন করেছে আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।

তিনি আরও জানান, এহসানের মস্তিস্ক ও চোখের জখম মারাত্মক হওয়ায় চিকিৎসার জন্য ভারতের চেন্নাইয়ে নিতে হচ্ছে বলে শুনেছি। চিকিৎসার জন্য সবাইকে তার পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানান তিনি।

এহসানের নিজ এলাকা কালীগঞ্জ উপজেলার নিয়ামতপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রাজু আহম্মেদ রনি জানান, ছেলেটি খুব ভাল। সে কোনও রাজনীতি করে না। আমি ঘটনাটি শুনেছি। বিষয়টি খুবই মর্মান্তিক। যারা এরকম মেধাবী ছাত্রের ওপর হামলা চালিয়েছে তারা ভাল কাজ করেনি। এটা চরম অন্যায় ও অপরাধ। যারা ঘটনার সাথে জড়িত তাদের শাস্তি হোক।

এহসান রফিকের পিতা রফিকুল ইসলাম মন্টু কালীগঞ্জের শহীদ নুর আলী কলেজের অধ্যাপক। তিনি একই সঙ্গে একটি টেলিভিশন চ্যানেলের ঝিনাইদহ প্রতিনিধি এবং একটি জাতীয় পত্রিকার কালীগঞ্জ উপজেলা সংবাদদাতা।

উল্লেখ্য, গত ৬ ফেব্রুয়ারি নিজের ধার দেওয়া ক্যালকুলেটর ফেরত চাওয়ায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা এহসানের ওপর হামলা চালায়। এ হামলায় তার একটি চোখ ও মস্তিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ ঘটনায় সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ছাত্রলীগের উপ-প্রশিক্ষণ বিষয়ক সম্পাদক মেহেদি হাসান হিমেল, সহ-সম্পাদক ওমর ফারুক ও সহ-সম্পাদক রুহুল আমিনসহ তিন ছাত্রলীগ নেতাকে বহিস্কার করেছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ।

মন্তব্য
Loading...