সংসদ রেখে আগাম নির্বাচন সম্ভব নয়

0 ১,০৩০

আগামী জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে আগাম নির্বাচনের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। বিশেষ করে বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার কারাদণ্ড এবং আওয়ামী লীগ আগেভাগেই নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করায় এই আওয়াজ জোরালো হয়েছে। তবে, প্রস্ততি থাকলেও সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেওয়ার মতো ঝুঁকি সরকার নেবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ, সংসদ বহাল রেখে আগাম নির্বাচনের কোনও সুযোগ সংবিধান অনুযায়ী নেই। এক্ষেত্রে আগাম নির্বাচনে যেতে হলে সংসদ ভেঙে দিয়েই যেতে হবে।

এদিকে, আগাম নির্বাচনের গুঞ্জনকে নাকচ করে দিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। দলটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আগাম নির্বাচনের কোনও আলোচনা দলের মধ্যে নেই। তার সম্ভাবনাও নেই।

প্রসঙ্গত, গত বছরের শেষ দিকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা যেকোনও সময়ে নির্বাচনের ইসির প্রস্তুতির কথা জানিয়েছিলেন। ওই সময়ই আগাম নির্বাচনের প্রসঙ্গটি সামনে চলে আসে। তবে এর সপ্তাহখানেকের মাথায় আগাম নির্বাচনের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, ‘আগাম নির্বাচনের কোনও সম্ভাবনা নেই, এ বিষয়ে সরকারের কোনও পরিকল্পনাও নেই।’

তবে, চলতি বছরের প্রথম থেকে ক্ষমতাসীন দলটি জোরেশোরে নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করলে এবং গত ৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে দণ্ডিত হওয়ার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে কারাগারে পাঠানো হলে নতুন করে আগাম নির্বাচনের বিষয়টি আলোচনায় আসে। বিএনপিকে অপ্রস্তুত রেখে দ্রুত নির্বাচনি বৈতরণী পার হওয়ার আশায় সরকার আগাম নির্বাচনের চিন্তা করছে— এমন মন্তব্যও উঠে আসছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের বক্তব্যে এই আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে। রবিবার রাজধানীর বনানীতে দলের কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে এরশাদ বলেন, ‘দেশে আগাম নির্বাচন হতে পারে বলে কথা ভেসে বেড়াচ্ছে বাতাসে। তার জন্য প্রস্তুত আছি। যখনই নির্বাচন হোক জাতীয় পার্টি অংশ নিতে প্রস্তুত রয়েছে।’

এদিকে, সংবিধানে সংসদ নির্বাচনের দু’টি বিধান রয়েছে। সংসদ ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে পরবর্তী ৯০ দিন ও মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার ক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্তির পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে ভোট হতে হবে। এ ক্ষেত্রে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন করতে চাইলে সরকারকে এ বছরের ৩১ অক্টোবর থেকে আগামী বছরের ২৮ জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। আর ৩১ অক্টোরের আগে নির্বাচন করতে চাইলে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করতে হবে। সেক্ষেত্রে সরকার বিদ্যমান থাকলেও সংসদ বিলুপ্ত থাকবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘নির্বাচনের বিষয়টি সংবিধানে ১২৩ অনুচ্ছেদে বলা রয়েছে। যদি সংসদ ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে ভেঙে দেওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে। আর যদি সংসদ তার ৫ বছরের মেয়াদ পূর্ণ করে, সেক্ষেত্রে মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন হবে।’

সাবেক নির্বাচন কমিশনার মো. শাহনেওয়াজও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘নির্বাচন কবে হবে, তা সরকারের ওপর নির্ভর করছে। সরকার চাইলে যেকোনও সময় নির্বাচন আয়োজন করতে পারে। তবে, সংসদের মেয়াদ শেষ হওয়ার ৯০ দিনের আগে নির্বাচন করতে হলে অবশ্যই সংসদ ভেঙে দিতে হবে। আর সংসদের মেয়াদের শেষ ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন করতে চাইলে সংসদ ভেঙে দেওয়ার প্রয়োজন পড়বে না।’

আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের আগাম নির্বাচনের ইচ্ছে থাকলেও সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন করার কোনও ইচ্ছেই তাদের নেই। দলটির মতে, সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেওয়া হলে তা বিএনপির জন্য নৈতিক বিজয় হবে। কারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণের শর্তে বিএনপির যেসব দাবি রয়েছে, তার অন্যতম হচ্ছে সংসদকে ভেঙে দেওয়া। দলটি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে সংলাপে গিয়েও এই দাবিটিকে প্রাধান্য দিয়েছিল বিএনপি।

আগাম নির্বাচনের বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘দেশে আগাম নির্বাচনের কোনও সম্ভাবনা নেই। এ নিয়ে এখনও দলের কোনও আলোচনা হয়নি। ক্ষমতার পূর্ণ মেয়াদ শেষ হলে এ বছরের ডিসেম্বরে জাতীয় নির্বাচন হবে।’

দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবদুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আগাম নির্বাচনের বিষয়টি স্রেফ গুজব। এ ধরনের কোনও সম্ভাবনা ও আলামত নেই।’

দলের সাংগঠনিক সম্পাদক খালিদ মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার একমাস পার না হতেই নির্বাচন, মধ্যবর্তী নির্বাচন— এমন অনেক ধরনের আলোচনাই শুনেছেন। কিন্তু তার সবগুলোই মিথ্যা বলে প্রমাণিত হয়েছে। এখন চলছে নির্বাচনের বছর। এ বছরের যখনই নির্বাচন হবে, সেটাই যথাসময়ে নির্বাচন। বছরের যেকোনও সময়ে নির্বাচন হলে তাকে আগাম নির্বাচন বলার সুযোগ নেই। সরকার তার সুবিধাজনক যেকোনও সময় নির্বাচন করতে পারে। তবে, এটা বলতে পারি— অগ্রবর্তীও না, মধ্যবর্তীও না, পরবর্তীও না— সংবিধান অনুযায়ী সময়মতো নির্বাচন হবে।’

বর্তমান দশম জাতীয় সংসদ বহাল রেখে নির্বাচন হবে বলে জানান আওয়াম লীগের এই সংসদ সদস্য।

মন্তব্য
Loading...