পুলিশের এ কেমন চাঁদাবাজি!

0 ৭১৭

ঢাকার দোহার উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের কার্তিকপুর সংলগ্ন জায়গার নাম মৈনট। ওপাড়ে ফরিদপুর জেলার চরভদ্রাসন উপজেলা আর এপাড়ে ঢাকার দোহার উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকা মৈনট ঘাট। পদ্মা নদীই মূলত পৃথক করেছে এ দু’টি জেলাকে। এক যুগ আগে দোহারের মৈনটঘাট থেকে চরভদ্রাসনের গোপালপুর ঘাটের মাধ্যমে যাত্রী পারাপার শুরু হলে ধীরে ধীরে মৈনটের নাম পরিচিতি পেতে থাকে। মৈনট ট্রলারঘাট দিয়ে ফরিদপুর জেলার দু’টি উপজেলার মানুষ পারাপার হয়ে থাকেন।
মানুষ পারাপারের পাশাপাশি প্রতিদিন দোহারের মৈনট নদী দিয়া পাবনা থেকে বালু নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়া আসা করে বালুবাহী বাল্কহেড।
কিন্তু নদীতে যে পুলিশ দায়িত্বে থাকে, তারা সব বাল্কহেড থেকে প্রতিদিন ২শত করে টাকা নেয়। বাল্কহেড চালকদের কাছে টাকা না থাকলে, তখন তেল (জ্বালানি) চাওয়া হয়। না দিলে খারাপ ব্যবহার করে, মার দিতে পর্যন্ত আসে। আবার অনেক নৌকায় কাগজপত্র দেখার কথা বলে ৫শত থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। এমনটিই বলেছেন এক বালুবাহী বাল্কহেড চালক।
সোমবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) বেলা ১১টায় দিকে এক গণমাধ্যমকর্মীর মোবাইলে ফোন করে এ অভিযোগ করেন এক নৌযানচালক। তিনি অবশ্য গণমাধ্যমে নাম-পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে এ কথা বলেন।
তার এই তথ্যের সূত্র ধরে বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) ভোর থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত দোহার উপজেলার মৈনট ঘাট এলাকার পদ্মা নদীতে অবস্থান করেন ওই গণমাধ্যমকর্মী। আর তার ক্যামেরায় ধরা পড়ে পদ্মার বুকজুড়ে নৌ পুলিশের চাঁদাবাজির দৃশ্যপট। মৈনট ঘাট এলাকার একটু সামনে থেকে নদীর বিলাসপুর অংশ পর্যন্ত চলে এই নৈরাজ্য। পুলিশ সদস্যরা ইঞ্জিনচালিত ছোট ট্রলার নিয়ে পদ্মা নদী দিয়ে নানা গন্তব্যে যেতে থাকা বালু ও পণ্যবাহী প্রতিটি ট্রলারে নির্বিঘ্নে টাকা তুলছে। এমন চিত্রও দেখা যায় যে ট্রলার মালিক চাঁদা তোলার বিষয়টি জানার কারণে আগে থেকে টাকা হাতে নিয়ে রেখেছেন। আর নৌ পুলিশ ট্রলার নিয়ে আসামাত্র তা তুলে দিচ্ছেন তাদের হাতে।
এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, বৃহস্পতিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) নদীতে ট্রলার নিয়ে চাঁদাবাজিতে মত্ত ছিলেন দোহারের কুতুবপুর নৌ পুলিশ ফাঁড়ির কনস্টেবল মো: ইমাম ও মো: রফিকুল ইসলাম। এদিন ওই ফাঁড়ির আটজন সদস্য পর্যায়ক্রমে নদীতে নামেন চাঁদাবাজির উদ্দেশ্যে। এই চাঁদাবাজি ভোর থেকে শুরু হয়ে চলে রাত পর্যন্ত।
এ বিষয়ে বালুবাহী বাল্কহেড চালক শেখ আবুল বলেন, ‘পুলিশ মাঝ নদীতে আসে নৌকা নিয়ে। টাকা না দিলে থানায় নিয়ে যেতে চায়, মার দিতে আসে। দিন-রাত ধরে এই টাকা নেয় ওরা। যে নৌকায় ধরুক কমপক্ষে ২শত টাকা নিবেই। আর বোট বড় আর মাল বেশি দেখলে ১ হাজার টাকা। টাকা না থাকলে তেলের গ্যালন ধরে নিয়ে যায়। টাকা না দিলে কেইস করে দিতে চায়। বলে কাগজপত্র দে। ধইরা নিবার চায়। কয়, চল, থানায় যাই।’
পাবনা থেকে আসা বালু শ্রমিক ফালু মিয়া বলেন, ‘আমরা বিদেশি মানুষ, টাকা না দিলে মাইরধইর করে পুলিশ। কয়, বোট ঘাটে ভিড়া। ১ হাজার টাহা নিয়া গেল কালকে। টাকা না দিলে নদী দিয়া যাওয়া যাবে না, তাদের কাছে কোনো আপিল নাই, দয়া নেই। না দিলে জোর-জুলুম করে হলেও নিবো।’
এ আরো অনেক বালুবাহী বাল্কহেড চালক বলেন, বোটের আকার ভেদে ২০০-২০০০ টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে পুলিশ।
স্থানীয়রা জানায়, পদ্মা নদীর মৈনট ঘাট দিয়ে পাবনা, রাজশাহী, ফরিদপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পণ্য, বালু, সিমেন্ট ও তেলবোঝাই জাহাজ ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত করে। নৌযানের আকার ও মালের ধরন দেখে প্রতিটি নৌযান থেকে ২০০ থেকে ২০০০ হাজার টাকা পর্যন্ত চাঁদা আদায় করে পুলিশ। শ্রমিক ও চালকদের অভিযোগ, সবচেয়ে বেশি চাঁদা দিতে হয় পুলিশকেই।
এ ব্যাপারে জানতে মৈনট ঘাটের পাশে অবস্থিত কতুবপুর নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ মিজানুর রহমানের কার্যালয়ে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। তার অবর্তমানে ফাঁড়ির দায়িত্বে ছিলেন এএসআই আলমগীর হোসেন।
তিনি গণমাধ্যমকর্মীকে জানান, মিজানুর রহমান দেশের বাড়িতে। নদীতে টাকা তোলার বিষয়টি জিজ্ঞাসা করতেই গুলিয়ে যান তিনি। এ সময় তিনি ওই গণমাধ্যমকর্মীকে সংবাদটি না প্রকাশ করার জন্য শুরু করেন বিভিন্ন কায়দার তোষামোদি করেন।
গণমাধ্যমকর্মীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ‘ভাই, একটু তো হয়ই, না করলে চলব কিভাবে? প্রতিদিন সরকার যে ৬ লিটার তেল দেয় তাতে হয় না। কী করব বলেন?’ সূত্র: কালেরকণ্ঠ।

মন্তব্য
Loading...