নারায়ণগঞ্জ-৫: ভাবির চ্যালেঞ্জের মুখে সেলিম ওসমান

0 ৬৪৯

জাতীয় পার্টির সাংসদ নাসিম ওসমানের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে দলের মনোনয়নের জন্য স্ত্রী পারভীন ওসমানের পক্ষে অনুচ্চ দাবি তুলেছিলেন নেতাকর্মীরা। তবে আওয়ামী লীগের সমর্থন ও জাতীয় পার্টির টিকিটে সহজেই জিতে গিয়ে এমপি নির্বাচিত হন ভাই সেলিম ওসমান। কিন্তু এবার ভাবি পারভীন ওসমানের পক্ষে মনোনয়নের জন্য জোরেশোরে নেমেছেন নেতাকর্মীরা। পারভীন ওসমানও যোগ দিচ্ছেন সভা-সমাবেশে। এসব দেখে মনে হচ্ছে আগামী নির্বাচনে মনোনয়ন নিয়ে ভাবীর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে যাচ্ছেন সেলিম ওসমান।

একাদশ জাতীয় সংসদের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে নারায়ণঞ্জ-৫ সংসদীয় আসনে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও বিএনপির মনোনয়ন-প্রত্যাশীদের সংখ্যা তত বাড়ছে। ইতিমধ্যে তিন দলের ১৩ জন মনোনয়ন-প্রত্যাশীর তালিকা পাওয়া গেছে। যদিও এর মধ্যে জাতীয় পার্টির বর্তমান এমপি সেলিম ওসমান এবং প্রয়াত এমপি নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমান এখনো নির্বাচনের কোনো ঘোষণা দেননি। কিন্তু তাদের নিজ নিজ অনুসারী নেতাকর্মীরা জোরালো দাবি তুলেছেন তাদের পক্ষে। অবশ্য দেবর-ভাবীর রাজনৈতিক কর্মকা- ও নির্বাচনী বক্তব্য নির্বাচনের দিকেই যাচ্ছে।

নাসিম ওসমানের মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৩০ এপ্রিল থেকে এ আসনের প্রতিটি এলাকায় যাচ্ছেন পারভীন ওসমান। সব জায়গায় তিনি রাজনৈতিক ও নির্বাচনী বক্তব্য দিচ্ছেন। এসব কর্মসূচিতে তার পক্ষে নির্বাচনের দাবি তুলছেন জাতীয় পার্টির নেতারা। তিনি বলছেন, নির্বাচন মুখ্য বিষয় নয়, এখানে উন্নয়ন মুখ্য বিষয়।

অন্যদিকে এ আসনে নৌকা প্রতীকের পক্ষে গণসংযোগের পাশাপাশি লাঙ্গলবিরোধী স্লেøাগান তুলেছেন আওয়ামী লীগের আট নেতা। তারা বিভিন্ন এলাকায় নিজ নিজ অনুসারী নেতাকর্মীদের নিয়ে গণসংযোগ, সভা-সমাবেশ করে যাচ্ছেন। দাবি করছেন এ আসনে আর জাতীয় পার্টিকে ছাড় দেয়া যাবে না। বিএনপির বিরুদ্ধে না বললেও তারা লাঙ্গলের বিরুদ্ধে বিভিন্ন কর্মসূচিতে বক্তব্য দিচ্ছেন।

এর পাল্টা জবাবও জাপার এমপি সেলিম ওসমান দিয়ে যাচ্ছেন। এখন বড় ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে তার ভাবি পারভীন ওসমানের মাঠে নামা। পারভীনের স্বামী প্রয়াত নাসিম ওসমান এ আসনে চারবার এমপি ছিলেন।

জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা দাবি করছেন, সেলিম ওসমান এমপি হলেও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা মূল্যায়িত হননি। তাই নাসিম ওসমানের স্ত্রী বেগম পারভীন ওসমানকে এ আসনে এমপি হিসেবে তারা দেখতে চান বলে স্লেøাগান তুলেছেন।

এখানে নৌকা প্রতীকের পক্ষে মাঠে নেমেছেন নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এ কে এম আবু সুফিয়ান। তিনি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. সেলিনা হায়াত আইভীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মানুষ হিসেবে পরিচিত। তার পক্ষে মেয়র আইভীর সমর্থন রয়েছে।

তার আগে থেকেই এ আসনে নির্বাচনী প্রচারণায় কাজ করে আসছেন আওয়ামী লীগের জাতীয় পরিষদ সদস্য ও জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি অ্যাডভোকেট আনিসুর রহমান দিপু, নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট খোকন সাহা, মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক জি এম আরাফাত, জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শুক্কুর মাহামুদ, জেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি আরজু রহমান ভুইয়া ও আবদুল কাদির।

তারা নির্বাচনী প্রচারণায় নৌকার পক্ষে ভোট চাওয়ার চেয়ে লাঙ্গলের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন বেশি। তাদের একটাই দাবি- এ আসনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী চাই। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে নারায়ণগঞ্জ আওয়ামী লীগের ভূমিকা রয়েছে। সেখানে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী থাকবে না সেটা আর হতে দেয়া যায় না।

এসব মনোনয়ন-প্রত্যাশী ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ও জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহ-সভাপতি মেয়র ড. সেলিনা হায়াৎ আইভীও জোর দাবি তুলেছেন জেলার পাঁচটি আসনেই নৌকা প্রতীকের প্রার্থী দেয়ার।

নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনটি জেলার সদর থানা ও বন্দর থানা এলাকা নিয়ে গঠিত। তবে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন এ আসনের কিছু এলাকা এদিক-সেদিক করে আসন বিন্যাস করেছে। তা হলো সিটি কর্পোরেশনের ভেতরে থাকা এলাকা যা ফতুল্লা থানাধীন তা নারায়ণগঞ্জ-৫ আসনের সঙ্গে যুক্ত থাকবে।

এ আসনের বন্দর থানার ৫টি ইউনিয়ন ও সদর থানার দুটি ইউনিয়ন এলাকা বাদে পুরো এলাকাটি নারায়ণগঞ্জ সিটি কর্পোরেশনের অন্তর্ভুক্ত। এ সিটি কর্পোরেশনের জনপ্রিয় মেয়র পদে রয়েছেন ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। ফলে একসময় যারা আইভীর বিরোধিতা করেছিলেন এমন কিছু মনোনয়নপ্রত্যাশী চাচ্ছেন এখন আইভীর সুদৃষ্টিতে আসতে। এখানে যার দিকে আইভীর সমর্থন থাকবে তার মনোনয়ন পাওয়ার দাবি জোরালো হবে বলে তাদের ধারণা।

এ আসনে বর্তমান এমপি মহাজোটের শরিক দল জাতীয় পার্টির এ কে এম সেলিম ওসমান ২০১৪ সালের ২৬ জুন উপনির্বাচনে লাঙ্গল প্রতীকে নির্বাচন করে এমপি হন। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন নাগরিক ঐক্যের নেতা সাবেক এমপি এসএম আকরাম। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এ আসন থেকে নির্র্বাচিত জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য নাসিম ওসমান ওই বছরের ৩০ এপ্রিল মারা গেলে সেখানে উপনির্বাচন হয়। ওই উপনির্বাচনেও নাসিম ওসমানের স্ত্রী পারভীন ওসমানের নির্বাচনের পক্ষে দাবি তুলেছিলেন নেতাকর্মীরা।

আর কয়েক মাস পর অনুষ্ঠিত হবে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রতিদিনই এ আসনের বিভিন্ন এলাকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক অনুষ্ঠান এবং নাসিম ওসমানের স্মরণে দোয়া মাহফিলে যাচ্ছেন পারভীন ওসমান। তিনি নির্বাচনের ঘোষণা দেননি বটে, তবে তার ইতিবাচক ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। নেতাকর্মীরাও তার পক্ষে জোরালো দাবি তুলেছেন। পারভীন ওসমান ও সেলিম ওসমান এখানে নির্বাচনের ঘোষণা দিলে মনোনয়ন নিয়ে দেবর-ভাবির বেশ একটা লড়াই হবে।

২০১৪ সালে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নৌকা প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছিলেন জাতীয় শ্রমিক লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি শুক্কুর মাহামুদ। মহাজোট থাকায় আসনটি জাতীয় পার্টিকে ছেড়ে দিলে তিনি মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নেন। পরে প্রয়াত নাসিম ওসমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন ওই আসনে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

মন্তব্য
Loading...