মেলার মেয়াদ বৃদ্ধি নিয়ে চেম্বারের প্রতারণা, মেলার সময় বৃদ্ধি হয়েছে এমন কোনো চিঠি আসেনি সংশ্লিষ্ট দপ্তরে!

0 ২৬৯


নিজস্ব প্রতিবেদক::বাংলাদেশের কোথাও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার আয়োজন হলে তা সরাসরি নিয়ন্ত্রণ করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। এমনকি মেলার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় যা আদেশ দিয়ে থাকেন স্থানীয় প্রশাসন তা কার্যকর করে। কিন্তু সিলেটের বেলায় এবার তা ভিন্ন! বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে সিলেটে চলমান সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ৫ম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নির্দেশ পৌছে। পরে স্থানীয় প্রশাসন মেলার কার্যক্রম বন্ধ করার সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি অবগত করেন। স্থানীয় প্রশাসনও এ্যাকশনে নামে। মঙ্গলবার এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ গিয়ে মেলা প্রবেশ মুখ বাশঁ দিয়ে বন্ধ করে দেন। বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে মেলার সময় বৃদ্ধি হয়েছে এমন একটি ভুয়া তথ্য স্থানীয় প্রশাসনকে প্রদান করেন সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ। তবে চেম্বার কর্তৃপক্ষ সময় বৃদ্ধির কোনো অনুমতির কাগজ দেখাতে পারেননি তাদের আবেদন ছাড়া! এদিকে স্থানীয় প্রশাসন বলছে, মেলার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় যা আদেশ দিবে স্থানীয় প্রশাসন তা কার্যকর করতে বাধ্য।

প্রশ্ন হল- যদি এমন হয়, তাহলে কিভাবে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজ কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রাখছ? নাকি স্থানীয় প্রশাসনকে একটি আবেদনের মাধ্যমে মেলা কর্তৃপক্ষ বোকা বানাচ্ছে? না এমন রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে স্থানীয় প্রশাসন বিষয়টি জেনেই মেলা কর্তৃপক্ষকে সহযোগীতা করছে! নাকি অন্যকিছু…

বিষয়টি নিয়ে সিলেটের ব্যবসায়ী মহল প্রশাসনের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। গত ৮ এপ্রিল মাসব্যাপী মেলার মেয়াদ শেষে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশক্রমে মেলার কার্যক্রম বন্ধ রাখার নির্দেশ প্রদান করা হয় এবং সেই সাথে স্থানীয় প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ প্রদান করা হয়। কিন্তু একই দিন মেট্রোপলিটন চেম্বারের সচিব স্বাক্ষরিত গণমাধ্যমে একটি বিজ্ঞপ্তি বিবৃতি পাঠানো হয়। বিবৃতিতে বরা হয়, মেলার মেয়াদ বৃদ্ধির অনুমোদন না থাকলেও সময় বর্ধিত হচ্ছে। অতি উৎসাহী কিছু সংবাদ মাধ্যম তা প্রচার এবং প্রকাশও করেন। এর ফলে মেলায় আগত স্টল মালিক এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে।

নাম প্রকাশ্যে অনিচ্ছুক নগরীর একাধিক ব্যবসায়ীরা জানান, সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের কিছু সদস্য নিজেদের লাভের জন্য সিলেটের গরীব সব ব্যবসায়ীদের পেটে লাথি মারছেন। এই বৈশাখে মেলার কারণে ব্যবসায়ীরা লসে পড়েছেন। তারা আরো জানান, চেম্বার কর্তৃপক্ষ এবার এই মেলাকে আগামী রমজান মাস পযর্ন্ত রাখার জন্য সব ধরণের চেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন।

একটি সূত্র জানায়, সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের এক নেতা, সিলেটের হোটেল ব্যবসায়ী এক নেতা এবং সিলেট জেলা ব্যবসায়ীদের এক প্রবীণ নেতা মেলার সময় বৃদ্ধি করার লক্ষে বুধবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে যান। তারা বাণিজ্যমন্ত্রী বরাবরে একটি আবেদন করেন। আবেদন পত্রে উল্লেখ করা হয়, তাড়াহুড়া করে অসম্পপূর্ণ অবস্থায় মেলার উদ্বোধন করা হয়েছে। যেখানে প্রায় ৬০ ভাগ স্টলের কাজ শেষ করা হয়নি। তাছাড়া, উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের কারণে মেলার কার্যক্রম বিঘ্নিত হয়েছে। তাই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে মেলার সময় বৃদ্ধি করা যুক্তিযুক্ত বলে উল্লেখ করা হয়। আর এই আবেদনটি গণমাধ্যমে মেইল করে পাঠানো হয় যে মেলার সময় বৃদ্ধি হয়েছে। আর সংবাদকর্মীরা কোনো কিছু যাচাই-বাছাই না করে ”সময় বৃদ্ধি হয়েছে বলে” সংবাদ প্রকাশ করেন!

এদিকে, বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের নির্দেশ সিলেট প্রশাসন উপেক্ষা করে বরং অবৈধ মেলাকে বৈধ করার জন্য সহযোগীতা করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

মাসব্যাপী সময় সম্পন্ন হওয়ায় সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের ৫ম আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলার সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে মেলা বন্ধের নির্দেশ এসেছে। ৭ এপ্রিল সোমবার স্বারক নং-২৬.০০.০০০০.১০৬.৮৬.০১২.১৭/১৪৭-এর মাধ্যমে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়ের উপসচিব মো. আমিনুল ইসলাম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে জানানো হয় বর্ণিত মেলা ৯ মার্চ ২০১৯ তারিখে উদ্বোধন করা হয়েছে ফলে ৮ এপ্রিল ২০১৯ তারিখে এক মাস পূর্ণ হবে। তাই মেলার সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য নির্দেশ এবং সিলেটের জেলা প্রশাসক ও সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে বিষয়টি অবগত করে বাণিজ্য মন্ত্রনালয়।

এ ব্যাপারে বাণিজ্য মেলার সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে মেলা বন্ধের নির্দেশ পেয়েছেন বলে জানান সিলেট প্রশাসন। নির্দেশ পাবার পর তারা প্রয়োজনীয় প্রদক্ষেপ গ্রহণ করেন।

ওইদিন মঙ্গলবার এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ গিয়ে মেলা প্রবেশ মুখ বাশঁ দিয়ে বন্ধ করে দেন। ঘন্টা খানিক পর তা আবার সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম শাহাদাত হোসেনের নির্দেশে তা আবার খুলে ফেলা হয়।

গতকাল শুক্রবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এই অবৈধ মেলার কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। টিকিট মাধ্যমে দর্শনাথীদের ভিতরে প্রবেশ করছেন। মেলার ভিতরে বিভিন্ন রাইড টিকিট মাধমে চলছে। মেলায় গান-বাজনা ও নগরীতে মাইকিংও হচ্ছে।

মেলার সময় বৃদ্ধির অনুমতি পেয়েছেন তবে এখনো কোনো কাগজ মন্ত্রনালয় থেকে আসেনি স্বীকার করে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কর্মাস এন্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সচিব মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, আপনি এ বিষয়ে সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বারের সিনিয়র সহ-সভাপতি শফিউল আলম চৌধুরী নাদেলের সাথে যোগাযোগ করেন। তিনি এ বিষয়ে আপনাকে বিস্তারিত জানাবেন।

গত মঙ্গলবার দুপুরে এয়ারপোর্ট থানা পুলিশ গিয়ে মেলা প্রবেশ মুখ বাশঁ দিয়ে বন্ধ করেছেন এবং মেলা কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে তাদের সকল কার্যক্রম বন্ধ রাখার জন্য বলে জানিয়েছেন সিলেট বিমানবন্দর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) এসএম শাহাদাত হোসেন। তিনি আরো জানান, কর্তৃপক্ষ তাকে মেলার মেয়াদ বৃদ্ধি হয়েছে এবং তারা অনুমতিও পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন। এ সংক্রান্ত বিষয়ে তিনি কোনো কাগজপত্র পেয়েছেন কি-না এমন প্রশ্নের জবাব দিতে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন।

সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার গোলাম কিবরিয়া বলেন, মেলার বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় যা আদেশ দিবে পুলিশ তা কার্যকর করতে বাধ্য। আমরা মেলা সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য মেলা কর্তৃপক্ষে নির্দেশ দিয়েছি।

এদিকে বাণিজ্য মেলার সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য বাণিজ্য মন্ত্রনালয় থেকে মেলা বন্ধের নির্দেশ পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন সিলেটের জেলা প্রশাসক এম কাজী এমদাদুল ইসলাম। তিনি প্রশাসনকে ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বলেছেন। মেলার সময় বৃদ্ধির অনুমতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মেলার সময় বাড়ানোর জন্য সিলেট মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স ইন্ডাস্ট্রি একটি আবেদন করেছে। তবে এ বিষয়ে বাণিজ্য মন্ত্রনালয় ব্যবস্থা নিবেন। আমাদের এখানে কোনো এখতিয়ার নেই।
আমি মেলা কর্তৃপক্ষের কাছে চিঠি পাঠিয়েছি তাদের সকল কার্যক্রম বন্ধ করার জন্য।

উল্লেখ্য, গত ৯ মার্চ শনিবার থেকে শুরু হওয়া মাসব্যাপী মেলা শেষ হয় সোমবার (৮ এপ্রিল)। ওই দিন মেলা সমাপ্ত হবার কথা থাকলেও মেলা কর্তৃপক্ষ মেলা বন্ধ করেন নি। মেলার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন বাণিজ্য মন্ত্রী টিপু মুনশি এমপিসহ প্রশাসনের কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দরা।

মন্তব্য
Loading...