Sylhet Express

পেটাতে পেটাতে হাঁপিয়ে গিয়েছিলাম

0 ১৯৬

ক্ষমতা আকড়ে রাখার এবং ভবিষ্যতে আরো পাকাপোক্ত করার সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন , যদিও যে কোন অঘটন ঘটার পরপরই বরাবরই আওয়ামীলীগের পক্ষ থেকে দাবী করা হয়, ছাত্রলীগ আওয়ামীলীগের কোন অঙ্গ সংগঠন নয়, বরং সহযোগী সংগঠন , তাই ছাত্রলীগের কোন দায়ভার আওয়ামীলীগের বর্তায় না, কিন্তু যখন দেখা যায়, খোদ প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে একদিনের মধ্যেই সেই ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারন সম্পাদককে সরিয়ে দেওয়া হয়, তখন এ কথা অনস্বীকার্য যে, অঙ্গ সংগঠন না সহযোগী সংগঠন , যে নামেই ডাকুক না কেন, তা আওয়ামীলীগের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্বাবধানেই পরিচালিত। আর সেই সংগঠনটিকে ব্যবহার করা হচ্ছে ভিন্ন মত ও চিন্তাধারাকে সমাজ থেকে চিরতরে ধ্বংস করার জন্য ।

ভবিষ্যতে ক্ষমতাকে আরো পাকাপোক্ত করতে ভিন্নমতকে অঙ্গুরেই শেষ করার এক নীলনকশা নিয়ে নেমেছে ঐতিহ্যবাহী ছাত্র সংগঠনটিকে। আর উপরের মহলের আজ্ঞা পালন করতে এরা হয়ে উঠছে হিংস্র থেকে হিংস্রতর।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ছাত্র আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আসামি মো. অনিক সরকার। অনিকের জবানবন্দীতে যে নৃশংসতার ছবি ফুটে উঠেছে, তা শুনলে ভাবতে কষ্ট হয়, এই অনিকও বুয়েটের মত শিক্ষা প্রতিষ্টানে পড়ুয়া এক মেধাবী ছাত্র ছিল কোন এক দিন। কিন্তু রাজধানীর কালো ছোবলে তাকে করে তুলেছে নৃশংস খুনি ।
গতকাল শনিবার ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালত তার জবানবন্দি রেকর্ড করেন। পরে অনিক সরকারকে কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন আদালত।

এর আগে এ মামলায় গত বৃহস্পতিবার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন ইফতি মোশাররফ ওরফে সকাল। গত শুক্রবার স্বীকারোক্তি দেন মেফতাহুল ইসলাম।

পুলিশ ও আদালত সূত্র বলছে, অনিক সরকার গতকাল দেওয়া জবানবন্দিতে আবরার ফাহাদকে ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে বেধড়ক পিটিয়ে গুরুতর জখম করার দায় স্বীকার করেছে। বুয়েট ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত এই নেতা বলেছে, আবরার ফাহাদকে পেটাতে পেটাতে এক সময় নিজেই ক্লান্ত হয়ে গিয়েছিলাম। ও (আবরার) মারা যাবে মারার সময় এটা বুঝতে পারিনি। শুধু আমি একাই নয়, সকালও আমার সঙ্গে আবরার ফাহাদদে বেধড়ক পিটিয়েছিল। এখন বুঝতে পারছি তাকে ওভাবে পেটানো ঠিক হয়নি।

অনিক সরকার তার জবানবন্দিতে আবরার ফাহাদকে ক্রিকেটের স্টাম্প দিয়ে শতাধিক আঘাত করার কথা স্বীকার করেন। মো. অনিক সরকার বুয়েট ছাত্রলীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। আবরার ফাহাদ হত্যাকা-ের ঘটনায় তাকে বহিষ্কার করে ছাত্রলীগ।
এদিকে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার আবরারের সহপাঠী মাজেদুর রহমান ওরফে মাজেদের ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছে আদালত। রিমান্ড শুনানির আগে কাঠগড়ায় সাংবাদিকদের মাজেদ জানিয়েছে, সে আবরারকে মারেনি। সেসহ কয়েকজন বাঁচানোর চেষ্টা করেছিলেন।

গতকাল শনিবার আসামি মাজেদের দশ দিনের রিমান্ড চেয়ে এবং অনিক সরকারের দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি গ্রহণের জন্য তাদের আদালতে হাজির করা হয়।

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর ডিবির লালবাগ জোনাল টিমের পুলিশ ইন্সপেক্টর মো. ওয়াহিদুজ্জামান আসামিদের আদালতে হাজির করেন।

যার মধ্যে ঢাকা মহানগর হাকিম আতিকুল ইসলাম আসামি অনিকের ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারার ওই জবানবন্দি গ্রহণ করেন। এর পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।

জানা গেছে, আবরার হত্যাকা-ের বর্ণনার সঙ্গে তার নিজের জড়িত থাকাসহ জড়িত অপর আসামিদের নাম প্রকাশ করেছেন অনিক সরকার।
স্বীকারোক্তিকারী অনিক বুয়েটের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র। তিনি রাজশাহী জেলার মহনপুর থানার বড়ইকুড়ি গ্রামের আনোয়ার হোসেনের ছেলে। সে মামলাটির এজাহারনামীয় ৩ নম্বর আসামি। এ আসামিই আবরারকে বেশি পিটিয়েছে বলে অভিযোগ।
মামলাটিতে গত ৮ অক্টোবর অনিকসহ দশ শিক্ষার্থীর ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন আদালত। ওই রিমান্ড চলমান অবস্থায় সে আদালতে দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করলেন।

এর আগে মামলাটি অনিকের সঙ্গে রিমান্ডে যাওয়া আরও ২ জন আসামি দোষ স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরা হলেন, বুয়েট শাখা ছাত্রলীগের বহিষ্কৃত উপ-সমাজসেবাবিষয়ক সম্পাদক ইফতি মোশাররফ সকাল ও ক্রীড়া সম্পাদক মো. মেফতাহুল ইসলাম জিয়ন।

এদিকে আসামি মাজেদের রিমান্ড আবেদনে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ওই আসামি এজাহারনামীয় ৮ নম্বর আসামি। মামলার তদন্ত, সাক্ষ্য প্রমাণে ও ভিডিও ফুটেজ পর্যালোচনায় এবং পারিপাশির্^ক সাক্ষ্য-প্রমাণে এ আসামি ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত থাকার সম্পর্কে যথেষ্ট সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে। ইতিপূর্বে গ্রেপ্তারকৃত আসামি ইফতি মোশারফ সকালের আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে এ আসামির নাম প্রকাশ করেছেন। তাই মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে অন্য আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারের জন্য এ আসামিদের ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন।

রিমান্ড শুনানিকালে রাষ্ট্রপক্ষে পুলিশের জিআরও এসআই মাজহারুল ইসলাম ও সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর হেমায়েত উদ্দিন খান হিরণ রিমান্ড আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন।

তবে মাজেদের পক্ষে কোনো আইনজীবী না থাকায় রাষ্ট্রপক্ষে একতরফা রিমান্ড আবেদনের শুনানির পর ঢাকা মহানগর হাকিম নিভানা খায়ের জেসী ৫ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে মঞ্জুরকৃত রিমান্ড ৮ কার্যদিবসের মধ্যে কার্যকর করার নির্দেশ দেন।

অন্যদিকে রিমান্ড শুনানির জন্য বেলা ৩টার দিকে আদালতের কাঠগড়ায় ওঠানোর পর বিচারক এজলাসে ওঠার আগে আসামি মাজেদ নিজে মারধরের সঙ্গে জড়িত নয় উল্লেখ করে সাংবাদিকদের বলেন, রাত সাড়ে ১০টার দিকে গালিবের সঙ্গে ২০১১ নম্বর রুমে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি হলের বড় ভাই অনিক আবরারকে মারতেছে। আমরা জুনিয়র হিসেবে ঠেকানোর কোনো উপায় ছিল না। তার আগে রবিনসহ কয়েকজন মারছে শুনছি। পরে অবস্থা খারাপ হওয়ায় সেখান থেকে ২০০৫ নম্বর রুমে নিয়ে যায়। সেখানে আবরারের আঘাতের স্থানে মলম লাগায়। মিজান পানি আনতে বললে পানি এনে আবরারকে খাওয়ায়। তার সঙ্গে মোরশেদ, আফাদ, তোহা ও শামীম বিল্লাহ আরবারকে বাঁচানোর চেষ্টাই করি। কিন্তু হলের নিয়ম অনুযায়ী আমরা বড় ভাইদের জোর করে কিছু বলতে পারিনি। অবস্থা খারাপ হলে অনিক ভাইদের কাছে হাসপাতালে নেওয়ার কথা বলি কিন্তু তারা শোনেননি। পরে অবস্থা আরও খারাপ হলে সিঁড়ির কাছে নিয়ে রাখতে বলে। ময়াজ, তামীম ও জেমি কোলে করে সিঁড়ির কাছে নিয়ে যায়। পিছে পিছে আমিও ছিলাম। তাই সিসি টিভিতে আমাকে দেখা গেছে। সিঁড়ির কাছে নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল, শিবির বলে পুলিশ ডেকে ধরিয়ে দেবে। পুলিশও ডেকেছিল। কিন্তু মারা যাওয়ায় দিতে পারেনি। রাত ৩টার দিকে আবরার মারা যায়। পরে ক্যান্টিনে নিয়ে রাখে।

৬ অক্টোবর রাত ৩টার দিকে শেরে বাংলা হল থেকে আবরার ফাহাদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। ওই রাতে হলের ২০১১ নম্বর কক্ষে আবরারকে পিটিয়ে হত্যা করেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা। হত্যাকা-ের ঘটনায় ১৯ জনকে আসামি করে পরের দিন সন্ধ্যার পর চকবাজার থানায় একটি হত্যা মামলা করা হয়। নিহত আবরারের বাবা বরকত উল্লাহ বাদী হয়ে মামলাটি করেন।
আবরার হত্যার ঘটনায় এখন পর্যন্ত ১৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এর মধ্যে ১৫ জন এজহারনামীয় আসামি। গতকাল শনিবার সকালে উত্তরা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে আবরার ফাহাদ হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বুয়েটছাত্র মোয়াজ আবু হুরাইরাকে। মোয়াজ বুয়েটের সিএসই বিভাগের ১৭তম ব্যাচের ছাত্র।

মন্তব্য
Loading...