Sylhet Express

এনআরসি আতঙ্কে কাঁটাতার পেরিয়ে ভারত থেকে দলে দলে ঢুকছে বাংলাদেশে

0 ২২

বিগত বেশ কয়েক মাস ধরেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ভারতের আসামে জাতীয় নাগরিক নিবন্ধন (এনআরসি) তালিকা । আলোচনায় ছিল কি হতে যাচ্ছে এই তালিকায় বাদ পড়ে যাওয়া মানুষের ভাগ্যে। তবে সম্প্রতি কালে এনআরসি আতঙ্ক ও স্থানীয় নির্যাতনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েছে অনেকেই । আর এ কারনেই বিগত কয়েকদিন অনেকেই অবৈধভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছে।
হঠাৎ করেই অবৈধ অনুপ্রবেশ মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই ঝিনাইদহের মহেশপুর উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী এলাকা দিয়ে বাংলাদেশে ঢুকছে মানুষ। ইতোমধ্যে গেল এক সপ্তাহে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গা সীমান্ত দিয়ে শিশুসহ অন্তত তিন শতাধিক নারী-পুরুষ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের চেষ্টাকালে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) হাতে আটক হয়েছে।

বিজিবি বলছে, যারা অবৈধভাবে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে এদের মধ্যে বেশির ভাগই মুসলমান। এরা এনআরসি আতঙ্ক ও স্থানীয় নির্যাতনে দেশ ছেড়ে চলে আসছেন। তারা আর ভারতে যাবেন না বলে বিজিবির কাছে জানিয়েছেন। সহায়-সম্বল নিয়ে তারা এদেশে চলে এসেছেন। তাদের আটকের পর অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

এদিকে আটক এইসব অনুপ্রবেশকারীরা নিজেদের বাংলাদেশের নাগরিক দাবি করে বলছে, তারা কাজের জন্য দীর্ঘদিন যাবত ভারতে অবৈধভাবে বসবাস করে আসছিলেন। কিন্তু হঠাৎ এনআরসি ঝামেলাসহ নানা নির্যাতনমূলক কর্মকাণ্ড শুরু হলে সঙ্গে পাসপোর্ট-ভিসা না থাকায় দালাল ধরে তারা বাংলাদেশে প্রবেশ করছেন।

এদিকে মহেশপুর সীমান্তে নিরাপত্তা আরও জোরদার হলে অনুপ্রবেশকারীরা পথ পরিবর্তন করে চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালায়। সেখানেও গেল কয়েক দিনে অনুপ্রবেশের সময় শিশুসহ অন্তত ২৭ জন নারী-পুরুষকে আটক করেছে বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী।

বিজিবি ৫৮ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল কামরুল আহসান বলেন, মাইগ্রেশন করে যারা ভারতে গিয়েছিলেন তাদের সেখানে বসবাসে অসুবিধা হচ্ছে। নানাভাবে তারা চাপের মধ্যে পড়েছেন। বিশেষ করে ব্যাঙ্গালুর এলাকায় এই সমস্যা বেশি হচ্ছে। যে কারণে তারা ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করছেন। তারা এক সময় বাংলাদেশে ছিলেন বলে দাবি করছেন। তারা বেশিরভাগ দুর্গম এলাকার ঠিকানা দিচ্ছেন। যে কারণে বিজিবি যাচাই করতে পারছে না। তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হয়েছে। আপাতত আটকদের অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ভারত থেকে অনুপ্রবেশ বন্ধে জীবননগর সীমান্ত সংলগ্ন নিরাপত্তা জোরদারের পাশাপাশি জিরো পয়েন্টের পাশ দিয়ে প্রতিনিয়ত টহল দিচ্ছে বিজিবি। স্থানীয় দালালরা অনুপ্রবেশকারীদের সহায়তা করছে। টাকার বিনিময়ে তাদের কাঁটাতারের বেড়া পাড় করে দিচ্ছে। গেল ক’দিনে অনেককে আটক করলেও বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের জন্য এখনও সীমান্তের ওপারে অনেক ভারতীয় নাগরিক অপেক্ষা করছে। এসব অনুপ্রবেশকারীরা বিজিবির চোখ ফাঁকি দিতে চায়। তবে বিজিবি সর্বদা তৎপর রয়েছে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে।

চুয়াডাঙ্গা-৬ বিজিবির পরিচালক মোহাম্মদ খালেকুজ্জামান জানিয়েছেন, তাদের অধীনে এখনও সীমান্ত এলাকাগুলোতে কোনও নারী-পুরুষ আটক হয়নি। তবে অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সদা প্রস্তুত।

এদিকে জীবননগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানিয়েছেন, জীবননগর সীমান্তের ৪টি পয়েন্ট দিয়ে গত কয়েকদিনে শিশুসহ অন্তত ২৭ জন অনুপ্রবেশকারীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করেছে বিজিবি। যাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়ে আদালতে হাজির করা হয়েছে।

অনুপ্রবেশকারীদের বেশিরভাগেরই এক কথা- তারা এনআরসি আতঙ্ক ও নানা চাপ আর নির্যাতনের মুখে ভারত ছেড়ে বাংলাদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। তারা আর ভারতে ফিরতে চান না। ভারতে তারা তাদের স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তি ফেলে এসেছেন। কিছু কিছু অন্য ধর্মাবলম্বী ছাড়া আটক ব্যক্তিদের মধ্যে অধিকাংশই মুসলিম।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঝিনাইদহের জেলা প্রশাসক সরোজ কুমার নাথ বলেন, গত শনিবার থেকে প্রচুর পরিমাণে নারী-পুরুষ ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত অঞ্চলে আটক হচ্ছেন। আটকরা দাবি করছেন- তারা বাংলাদেশের নাগরিক। কারাগারে পাঠানোর পর তাদের সঙ্গে আমি কথা বলেছি।

তাদের ভাষ্য, তারা পাসপোর্ট ছাড়াই ভারতে ছিল। ওখানে কোনো বাসা বাড়ি বা প্রতিষ্ঠানে কাজ করতো। সম্প্রতি ওখানে তাদেরকে কিছু লোকজন খোঁজ করছে এবং যারা তাদেরকে আশ্রয় দিয়েছিল তারা তাদেরকে বলেছে তারা তাদের আর রাখতে পারবে না। তখন বাধ্য হয়ে তারা ভারতের স্থানীয় দালাল ধরে ঝিনাইদহের মহেশপুর সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করার পর বিজিবির হাতে আটক হচ্ছেন।

জেলা প্রশাসক বলেন, আমি তাদের বক্তব্য যাচাই করেছি, তারা বাংলাদেশের নাগরিক। তারা পাসপোর্ট ছাড়াই ভারতে গিয়েছিল।

এনআরসি জটিলতায় আসাম থেকে যেভাবে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশের ঘটনা ঘটছে তাতে করে ঝিনাইদহ ও চুয়াডাঙ্গার সীমান্ত এলাকার স্থানীয় বাংলাদেশিদের মধ্যে চিন্তার ছাপ পড়েছে। মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গারা শুরুতে কক্সবাজারের স্থানীয়দের কাছে আশ্রয় নিলেও পরবর্তীতে তারা যেভাবে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছে, ঠিক একই শঙ্কা কাজ করেছে স্হানীয়দের মধ্যে ।

মন্তব্য
Loading...