Sylhet Express

আতঙ্কে শামসুদ্দিনের চিকিৎসকসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা, হাসপাতাল থেকে যেতে হয় বাসায়

0 ১৫৩

সিলেটের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে কাজ করা এক সেবিকা স্বামী সন্তান নিয়ে নগরীতে একটি ভাড়া বাসায় থাকেন। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তিনি ডিউটি করেন শামসুদ্দিন হাসপাতালে। ডিউটি শেষ করে ফিরেন বাসায়। সুরক্ষা সরঞ্জাম পরে কাজ করলেও বাসায় ফেরার সময় আতঙ্কে থাকেন তিনি। পরিবারের সুরক্ষা নিয়ে সবসময় দুশ্চিন্তায় থাকতে হয় তাকে।নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই সেবিকা বলেন, এক রুমের একটি বাসায় ভাড়া থাকি। এই রমেই বাথরুম। তাই ডিউটি শেষ করে বাসায় ফিরে সোজা বাথরুমে প্রবেশ করেও মনের সংশয় দূর হয় না। কারণ এই রুমেই থাকেন আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। বাচ্চাটা ছোট তাই অকে নিয়েই বেশি ভয়। আমার মত এই হাসপাতালে কর্মরত সবাই তাদের পরিবারের সদস্যদের সুরক্ষা নিয়ে ভয়ে থাকেন।

এই সেবিকা আরও বলেন, ডিউটি শেষ করে আমরা বাড়ি ফিরতে চাই না। কারণ আমাদেরকে আক্রান্তের সংস্পর্শে যেতে হয়। আমাদেরকে হোটেল বা অন্য কোথাও থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হোক। আমরা ১ সপ্তাহ ডিউটি শেষে, ১৪ দিন অন্য কোথাও কোয়ারেন্টিন পালন করে যদি বাসায় ফিরি তাতে অন্তত আমাদের পরিবারের সদস্যরা নিরাপদে থাকবেন।কেবল ওই একজনই নন। এমন আতঙ্ক আর উদ্বেগে রয়েছেন শামসুদ্দিন হাসপাতালে কর্মরত সকল চিকিৎসক-সেবিকাসহ স্বাস্থ্যকর্মীরা। সিলেটের এই হাসপাতালটিতে করোনা আইসোলেশন সেন্টার ঘোষণা দিয়ে করোনা আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। ফলে এই হাসপাতাল কাজ শেষে বাসায় ফিরতে হওয়ায় পরিবার নিয়ে আতঙ্কে আছেন তারা।

ইতোমধ্যে শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালের এক স্টোর কিপার করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তিনিও পরিবারের সাথে নগরীর কাজী ইলিয়াস এলাকায় থাকেন। ওই স্টোর কিপারের করোনা পজেটিভ আসার পর তার পরিবারের সদস্যদেরও আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। পরীক্ষার জন্য পরিবারের ৩ সদস্যের নমুনাও সংগ্রহ করা হয়েছে।বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশনের (বিডিএফ) ও সোসাইটি ফর নার্সেস সেফটি অ্যান্ড রাইটস সংগঠনের হিসাব অনুযায়ী দেশে এই পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছে ১২৮ জন চিকিৎসক ও ৭১ জন নার্সসহ মোট ১৯৯ জন। আক্রান্তদের সংস্পর্শে এসেছে এমন ছয় শতাধিক স্বাস্থ্যকর্মী হোম কোয়ারেন্টিনে আছেন। অর্থাৎ চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী (মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, কম্পিউটার অপারেটর, এলএমএসএস, আয়া, ওয়ার্ডবয়, মালি, সুইপার ও নিরাপত্তাকর্মী) মোট আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় ১০ শতাংশের ওপরে।এখন পর্যন্ত সিলেট বিভাগে ৩ জন চিকিৎসক, ৩ জন নার্স/ব্রাদার ও ৩ জন স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ১ জন চিকিৎসক মারা গেছেন।

স্বাস্থ্যকর্মীদের সঠিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকা ও আইসিইউতে জনবল সংকট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আইসিইউতে কর্মরত এক চিকিৎসক। তিনি বলেন, সুরক্ষা সরঞ্জাম পরেও প্রতিনিয়ত চিকিৎসক থেকে শুরু করে স্বাস্থ্য বিভাগে কর্মরতরা করোনায় আক্রান্ত হচ্ছেন। যেহেতু আমরা করোনা সংক্রমিত রোগীদের সেবা দিচ্ছি তাই আমাদের সংক্রমিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এজন্য আমরা কেউই ডিউটি করে বাসায় ফিরতে চাই না। কারণ বাসায় যাওয়া মানেই আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের আক্রান্ত হওয়ার ভয় থাকে। এ ব্যাপারে অনেক বার বলেছি আমরা কিন্তু কোনো কাজ হচ্ছে না। এখানে উপর লেভেলের কর্তাদের মধ্যে অনেক সমন্বয়হীনতা রয়েছে।তিনি বলেন, এখানে চিকিৎসারত করোনা রোগী সবচেয়ে বেশি কাছে যেতে হয় নার্স, আয়া, ওয়ার্ড বয়, ক্লিনারদের। কিন্তু তাদের কতজনকে আমরা এন৯৫ মাস্ক দিতে পেরেছি।

আইসিইউতে জনবল সংকট নিয়ে তিনি বলেন, শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের আইসিইউতে ২টি বেড আছে। আরও ২০টি বেড প্রস্তুত আছে। ১৪টি ভেন্টিলেটর আছে। কিন্তু এসব পরিচালনার জন্য নেই পর্যাপ্ত জনবল। এসব থাকলেও দক্ষ জনবল ছাড়া কাউকে সঠিক সেবা দেওয়া সম্ভব না।সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা.আবু শাইম মো. মেছবাহ উদ্দিন প্রতি মঙ্গলবার রাউন্ডে যান শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে। তিনি বলেন, রোগীদের তো সেবা দিতেই হবে। আমি সেখানে কর্মরত জুনিয়র চিকিৎসক, আরএমও, নার্সসহ সকলের সমন্বয়ে আক্রান্তদের সেবা দেই।তিনি বলেন, এমনিতেও রোগী দেখার সময় অনেক সাবধানতা অবলম্বন করি। তবে এ মুহূর্তে একটু বেশি সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। এখন প্রটেকশন একটু বেশি নিতে হচ্ছে। শামসুদ্দিনে যখন যাই তখন শতভাগ প্রটেকশন নিয়ে যাই। চেষ্টা করি আমিসহ পরিবারের সকলকে সেইভ রাখার।

এ ব্যাপারে এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপ পরিচালক ডা. হিমাংশু লাল রায় বলেন, শামসুদ্দিন হাসপাতালে যারা কর্মরত আছেন তারা ১ সপ্তাহ ডিউটি করে ১৪ দিন কোয়ারেন্টিনে থাকবেন। গত ২ সপ্তাহ ধরে আমরা এই চেইন মেন্টেইন করছি। শামসুদ্দিন হাসপাতালের চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মী যারা আছেন তাদের সুরক্ষার জন্য আমরা অনেক আগেই তাদের আলাদা আবাসন ব্যবস্থা করার জন্য প্রস্তাব দিয়েছে। কারণ স্বাস্থ্য বিভাগের একার পক্ষে এত সংখ্যক জনবলের আবাসন ব্যবস্থা করা সম্ভব নয়। এর জন্য প্রশাসন সহ সকলের সহযোগিতা দরকার।তিনি বলেন, তাদের আবাসনের দাবি আমরা অনেকবার উত্তাপন করেছি কিন্তু এখন পর্যন্ত এর কোনো আনুষ্ঠানিক ফলাফল আসেনি।এ ব্যাপারে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহাম্মদ আবুল কালাম বলেন, যারা করোনা আক্রান্তদের সেবা দিচ্ছেন তাদের জন্য আবাসনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। বিআরডিটিএ তে থাকার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ডিসি স্যার ইতোমধ্যে ২টি হোটেলের সাথেও কথা বলেছেন। এ ব্যাপারে দ্রুতই ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক ভাবে চিঠি দেওয়া হবে।

সিলেট স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক সুলতানা রাজিয়া বলেন করোনা আক্রান্তদের যারা সেবা দিচ্ছেন তাদের জন্য অবশ্যই আলাদা আবাসন ব্যবস্থা করা দরকার। কারণ যারা সরাসরি আক্রান্তদের সেবা দিচ্ছেন তাদের ও তাদের পরিবারের সুরক্ষা সবার আগে প্রয়োজন। তাই এ ব্যাপারে উদ্যোগ নেওয়ার জন্য আমি সিভিল সার্জনকে চিঠি দিয়েছে। তবে তাদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থা হয়েছে কি না সেটা এখনো জানি না।

মন্তব্য
Loading...